ট্রাম্পের ‘ড্রিল বেবি, ড্রিল’ ও ভূরাজনৈতিক-অর্থনৈতিক অস্থিরতা

ধীর হয়ে এসেছে বৈশ্বিক জ্বালানি খাতের রূপান্তর প্রক্রিয়া

যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় ডোনাল্ড ট্রাম্প জীবাশ্ম জ্বালানির উৎপাদন বৃদ্ধির আহ্বান জানিয়ে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোকে বলেছিলেন ‘ড্রিল বেবি, ড্রিল’।

যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় ডোনাল্ড ট্রাম্প জীবাশ্ম জ্বালানির উৎপাদন বৃদ্ধির আহ্বান জানিয়ে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোকে বলেছিলেন ‘ড্রিল বেবি, ড্রিল’। তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর এ আহ্বানে সাড়া দিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরের প্রতিশ্রুতি থেকে সরে এসে আবারো জীবাশ্ম জ্বালানি উত্তোলন বৃদ্ধিতে মনোযোগ দিয়েছে এ খাতের বৈশ্বিক জায়ান্ট কোম্পানিগুলো। আবার ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে অনেক দেশ এখন ডিকার্বনাইজেশনের পরিবর্তে জ্বালানি নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এ কারণে জীবাশ্ম থেকে পরিচ্ছন্ন জ্বালানিনির্ভরতায় রূপান্তরের বৈশ্বিক প্রক্রিয়াটি এখন অনেকটাই ধীর হয়ে এসেছে। খবর এফটি।

কয়েক বছর ধরে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাত অগ্রাধিকারে দিয়েছিল বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় জ্বালানি তেল কোম্পানি বিপি, শেভরন, এক্সনমবিল, শেল ও টোটালএনার্জিস। তবে কোম্পানিগুলোর নির্বাহীরা সম্প্রতি বিভিন্ন মাধ্যমে জানিয়েছেন, তারা ফের নতুন মজুদ নিশ্চিত করার দিকে মনোযোগ দিচ্ছেন।

জ্বালানি কোম্পানিগুলোর শীর্ষ নির্বাহীদের এসব বক্তব্যের বরাত দিয়ে বিশ্লেষকরা বলছেন, পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে রূপান্তর প্রত্যাশার তুলনায় ধীরগতিতে হবে। ফলে আগামী কয়েক দশক জীবাশ্ম জ্বালানির শক্তিশালী চাহিদা দেখা যাবে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, দ্রুত জ্বালানি রূপান্তরের প্রত্যাশা শিথিল হওয়ার পেছনে আরো কিছু কারণ দেখা যাচ্ছে। এর মধ্যে অন্যতম উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও সুদহার, যা নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণ খাতে খরচ বাড়িয়েছে এবং অগ্রগতি মন্থর করেছে।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক পরামর্শক সংস্থা উড ম্যাকেঞ্জির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, শ্লথ জ্বালানি রূপান্তরের কারণে ২০৩০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে প্রতি বছর বিশ্বে পূর্বাভাসের তুলনায় প্রায় ৫ শতাংশ বেশি জ্বালানি তেলের প্রয়োজন হতে পারে। এ ঘাটতি পূরণে ২০৫০ সালের মধ্যে অতিরিক্ত ১০ হাজার কোটি ব্যারেল জ্বালানি তেল ও গ্যাস দরকার হবে।

জ্বালানি তেলের চাহিদা বাড়ার এ পূর্বাভাস এরই মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। কারণ দীর্ঘদিন ধরে এ শিল্পে যথেষ্ট বিনিয়োগ না হওয়ায় কোম্পানিগুলো ভবিষ্যতের চাহিদা মেটাতে পুরোপুরি প্রস্তুত নয়।

উড ম্যাকেঞ্জির আমেরিকাস এক্সপ্লোরেশন রিসার্চ বিভাগের প্রধান জেসিকা সিওসেক জানান, জ্বালানি তেল ও গ্যাসের সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। একীভূতকরণ ও অধিগ্রহণ (এমঅ্যান্ডএ) চুক্তির মাধ্যমেও তা দীর্ঘমেয়াদে সমাধান করা যাবে না। তাই কোম্পানিগুলো শুধু খননের জন্য প্রস্তুত এমন প্রকল্প নয়, বরং সম্ভাব্য খনন এলাকাগুলোও আয়ত্তে আনতে আগ্রহী।

চলতি দশকের শুরুর দিক থেকে জীবাশ্ম জ্বালানির নতুন মজুদ অনুসন্ধানে মনোযোগ কম দিয়ে এসেছে কোম্পানিগুলো। এর বদলে খরচ কমানো ও দ্রুত সবুজ জ্বালানিতে রূপান্তরের প্রস্তুতিতে মনোযোগ দিয়েছিল এসব প্রতিষ্ঠান। এখন তারা আবার পুরনো ব্যবসায় ফিরে এসেছে। পরামর্শক সংস্থা রাইস্ট্যাড এনার্জির তথ্যানুযায়ী, গত বছর মোট ৫০০ কোটি ব্যারেল জ্বালানি তেলের মজুদ আবিষ্কৃত হয়েছে, যা বিশ্বের বার্ষিক উৎপাদনের ১৯ শতাংশের সমতুল্য।

জ্বালানি খাতের এ বাঁক বদলে চোখে পড়ার মতো পরিবর্তন এসেছে বিপিতে। পরিচ্ছন্ন জ্বালানি কৌশল বাস্তবায়নে ২০২১ সাল থেকে কোম্পানিটি ১ হাজার ৫০০ কোটি ডলার ব্যয় করেছে, যা বিপি থেকে বিনিয়োগকারীদের দূরে সরিয়ে দেয়। মুনাফা বৃদ্ধি ও মজুদ গড়ে তোলার চাপে পড়ে ফেব্রুয়ারিতে জ্বালানি তেল ও গ্যাসে বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর ঘোষণা দেয় বিপি। কোম্পানিটি আগামী তিন বছরে ৪০টি অনুসন্ধান কূপ খনন করবে। সম্প্রতি ব্রাজিল উপকূলে গত ২৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় মজুদ আবিষ্কার করেছে বিপি।

কয়েক বছর ধরে খরচ কমানোর চেষ্টায় রয়েছে শেভরন। এ কারণে শেলের বাইরে ঝুঁকিপূর্ণ গভীর সমুদ্র প্রকল্পে বিনিয়োগ কমিয়ে এনেছিল তারা। গত বছর কোম্পানির জ্বালানি তেলের মজুদ নেমে যায় ৯৮০ কোটি ব্যারেলে, যা এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। চলতি মাসে আর্থিক প্রতিবেদনসংক্রান্ত বৈঠকে কোম্পানির প্রধান নির্বাহী মাইক ওয়ার্থ জানান, গত কয়েক বছরের অনুসন্ধান ফলাফলে তিনি সন্তুষ্ট নন। ২০২৪ সাল থেকে শেভরনের আওতায় এসেছে ১ কোটি ১০ লাখ একর নতুন অনুসন্ধান এলাকা।

গত এক দশক গায়ানার দিকে নজর ছিল এক্সনমবিলের। এখন তারা মজুদ বাড়াতে অন্য উৎসের দিকেও হাঁটছে। গত সপ্তাহে লিবিয়ার সমুদ্রসীমায় চারটি ব্লকে অনুসন্ধান চালাতে চুক্তি সই করেছে কোম্পানিটি। দুই দশক পর ত্রিনিদাদ অ্যান্ড টোবাগোয় ফের অনুসন্ধান শুরুর প্রস্তুতিও নিচ্ছে।

টোটালএনার্জিসের প্রধান নির্বাহী প্যাট্রিক পুইয়ানে সম্প্রতি জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও আলজেরিয়ায় নতুন অনুসন্ধানের অনুমোদন পেয়েছে। অন্যদিকে শেলের প্রধান নির্বাহী ওয়েল সাওয়ান জানিয়েছেন, ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কূপ খনন হবে। তাদের আগ্রহের কেন্দ্রে রয়েছে মেক্সিকো উপসাগর, মালয়েশিয়া ও ওমান।

রাইস্ট্যাডের জ্যেষ্ঠ আপস্ট্রিম বিশ্লেষক পালজর শেঙ্গা বলেন, ‘জ্বালানি রূপান্তর যত দ্রুত হবে ভেবেছিলাম, তত দ্রুত হচ্ছে না। এমনকি ২০৫০ সালেও মোট জ্বালানির অর্ধেক জুড়ে থাকবে জ্বালানি তেল ও গ্যাস। এখানে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে।’

নতুন করে মনোযোগ সত্ত্বেও জ্বালানি খাতে অনুসন্ধান ব্যয় এখনো ২০১০-১৫ সালের শীর্ষ পর্যায়ের তুলনায় অনেক নিচে। অবশ্য বিপি ও শেভরনের দাবি, বাজেট না বাড়িয়েই অনুসন্ধান বাড়াতে সহায়তা করছে নতুন প্রযুক্তি। এর সঙ্গে যুক্ত করে উড ম্যাকেঞ্জির আপস্ট্রিম বিশ্লেষণ প্রধান ফ্রেজার ম্যাককে বলেন, ‘এখনো খননের জন্য প্রস্তুত আছে এমন এলাকা কম। তাই বড় কোম্পানিগুলোকে দক্ষতা পুনর্গঠন করতে হবে।’

আরও